ছোট বেডরুমকে বড় দেখানোর উপায়

ছোট বেডরুমকে বড় দেখানোর কিছু সহজ উপায়

আজকাল শহুরে জীবনে ছোট ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টে থাকা খুবই সাধারণ। অনেকেরই বেডরুম ছোট হওয়ায় মনে হয় যেন জায়গা কম পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু চিন্তার কোনো কারণ নেই! কিছু স্মার্ট ডেকোরেশন টিপস প্রয়োগ করে আপনার ছোট বেডরুমকেও অনেক বড় এবং প্রশস্ত দেখাতে পারেন। এই টিপসগুলো সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর। চলুন জেনে নিই কয়েকটি উপায়।

১ পেইন্টিংঃ

Bedroom painted in a light color with soft walls creating a calm and airy feel.

ছোট ঘর বড় দেখাতে গেলে রঙের ভুমিকা সবার প্রথমে আসে। পেইন্টিংয়ের জন্য তিনটা জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ – 

ক –  ঘরের রং সব সময় হালকা হতে হবে।

খ – কখনোই  ঘরের রং ম্যাট ফিনিশে করা যাবে না।

গ – পেইন্টের মাধ্যমে দেয়ালে কোন পার্টিশন বা ভাগ করা উচিত নয়।

ক – হালকা রং ব্যাবহার করা

ছোট ঘরকে বড় দেখানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো দেওয়াল, সিলিং এবং ফার্নিচারে হালকা রঙ ব্যবহার করা। গাঢ় রঙ এড়িয়ে চলুন, কারণ তা ঘরকে আরও ছোট দেখায়। ঘরের রং সবসময় হালকা শেডের রাখুন। এর কারন খুবই সহজ, ডার্ক কালারের রং ঘরের আলো শোষণ করে ফেলে। যার ফলে ঘরকে আরও ছোট ও চাপা দেখায়। অন্যদিকে হালকা রং যেমন অফ-হোয়াইট, বেইজ গ্রে, প্যাস্টেল, এগুলো আলোকে অনেক বেশি রিফ্লেক্ট করে। ফলে ঘরকে অনেক বেশি প্রশস্ত এবং উজ্জ্বল বলে মনে হয়।

খ – ম্যাট ফিনিশের পেইন্ট ব্যাবহার না করা

পেইন্টের ফিনিশ সাধারনত দুই ধরণের হয়, ম্যাট এবং গ্লস। আপনার ছোট বেডরুমে ম্যাট ফিনিশের রং কখনোই ব্যাবহার করবেন না। কারন ম্যাট ফিনিশের রং ঘরে প্রবেশ করা ন্যাচারাল আলো শোষণ করে ফেলে। তাই ঘরকে আরও বেশি ছোট এবং চাপা বলে মনে হয়। তাই আপনার ছোট অ্যাপার্টমেন্টের সকল রুমে গ্লস ফিনিশের রং ব্যাবহার করবেন, যেটা প্রাকৃতিক আলোকে রিফ্লেক্ট করে বেডরুমকে বড় দেখায়।

গ – পেইন্টের মাধ্যমে দেয়ালে পার্টিশন বা ভাগ।

পেইন্টের মাধ্যমে দেয়ালে কোন পার্টিশন বা ভাগ তৈরি করবেন না। অনেকে ঘরের দেয়ালের একপাশে এক রং এবং অন্য পাশে ভিন্ন ধরণের রং দিয়ে ঘরের মধ্যে সুন্দর ডিজাইনের তৈরি করে। কিন্তু ছোট বেডরুমের জন্য এইটা একটা বিশাল ভুল, যেই ভুলটা অনেকেই করে। বড় ফ্ল্যাট বা বেডরুমের জন্য পেইন্টের পার্টিশন খুব সুন্দর দেখাই, ছোট বেডরুমের  জন্য এই কালার পার্টিশন ধারণা একদম মানানশ্বই না। তাই ছোট বেডরুমের জন্য এক কালারের পেইন্টিং করলে আপনার বেডরুমকে বড় দেখাবে।

২ মাস্টার ওয়ালঃ  

অনেকেই বলে পুরো দেয়াল এক কালার রাখলে বেডরুমটা একঘেয়ে হয়ে যায়। এইজন্য মাস্টার ওয়াল, ফিচার ওয়াল বা ফোকাল পয়েন্ট ওয়াল তৈরির বিষয় চলে আসে। মাস্টার ওয়ালের জন্য মনোক্রোম্যাটিক থিমের পেইন্টের দেয়াল দরকার। মনোক্রোম্যাটিক থিমের মানে হল আপনার ঘরে যদি বেইজ থিমের পেইন্টিং কালার ব্যাবহার করেন, তাহলে মাস্টার ওয়ালেও একই কালারের রং ব্যাবহার  করতে হবে। মাস্টার ওয়ালের রং, বেডরুমের মূল কালারের রং থেকে কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য ফ্যামিলি কালারের রং হওয়া যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, ঘরের তিনটা দেয়ালের রং অফ-হোয়াইট, তাহলে মাস্টার ওয়ালেও  অফ-হোয়াইট বা আশেরপাশের কালারের রং ব্যাবহার করতে হবে। আপনি সেখানে কিছু ডিজাইন বা এলিমেন্ট যোগ করুন, যেমন ওয়াল পানেলিং, ওয়াল টিমস, ফটো আর্টফেম বা গ্রুপ লাইন।  এইগুলার মধ্যে যেকোন একটা এলিমেন্ট যোগ করলে দেয়ালটা হবে ঘরের মাস্টার ওয়াল।

যখন বেডরুমে মাস্টার ওয়ালের ডিজাইন দিবেন, তখন চেষ্টা করবেন ভাটিকাল প্যাটার্নের ডিজাইন দিতে। কারন ভাটিকাল প্যাটার্নের লাইন আমাদের চোখে এমন একটা দারুন ইলিউশন তৈরি করে যাতে আমাদের ফোকাসটা ঘরের উচ্চতার দিকে চলে যায়। অর্থাৎ ঘরের ছাদের উচ্চতা অনেক বেশি বলে মনে হয় আর রুমকেও বড় লাগে।

Feature wall in modern flat

৩ ফার্নিচারঃ

ফার্নিচার হিসাবে আপনি যেকোন মেটেরিয়ালই ব্যাবহার করেন না কেন, বেডরুমের ফার্নিচার যেন গ্লসি ফিনিশের হয়। যেমন পার্টিকেল বোর্ড, অ্যাক্রিলিক বোর্ড, ভিনিয়ার বোর্ড, লেমিনেট বোর্ড, ভেকু লেয়ার, দিয়ে বেডরুমে গ্লসি ফিনিশের ফার্নিচার তৈরি করলে ভাল। ফলে বেডরুমকে আরও উজ্জল ও বড় দেখায়। ফার্নিচারে অনেক বেশি ভারী ডিজাইন এবং হেভি প্যাটার্ন এড়িয়ে চলুন। কারন হেভি প্যাটার্ন ফার্নিচার একটা ছোট বেডরুমকে আরো বেশি ভরাট এবং কনজাস্টেড করে তুলে। এই জন্য ফার্নিচার যতটা সম্ভব সিম্পল এবং প্লেইন ডিজাইনের করা উচিত। প্লেইন ডিজাইনের মধ্যে হালকা কিছু টেক্সচার বা কন্ট্রাস্ট ব্যাবহার করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি বেডরুমে একটা কেবিনেট বানাবেন, সেক্ষেত্রে  কেবিনেটের বডিটা আপনি  সিম্পল এবং এক রঙের রাখুন, এর ডোর হ্যান্ডল এবং শেপে নতুনত্ব আনুন।  

৪. মাল্টিফাংশনাল ফার্নিচার

বেডরুম সুন্দর ও বড় দেখানোর জন্য ফার্নিচার প্লেসমেন্ট সবথকে গুরুত্বপূর্ণ । এক্ষেত্রে একটা রুলস  সবসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ  Rule of 50/50.  এই রুল অনুযায়ী, আপনার রুমের মোট ফ্লোরের  ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশের বেশি জায়গা যাতে ফার্নিচার দখল না করে, বাকি ৫০ থেকে ৪৫  শতাংশ জায়গা ফাঁকা থাকে। অর্থাৎ ঘরের প্রায় অর্ধেক জায়গা যাতে ফাঁকা থাকে।  উদাহরণস্বরূপ, একটা বেডরুমের সাইজ ১০*১০ ফিট মানে টোটাল রুমের সাইজ ১০০ স্কোয়ার ফিট। যদি আপনার বিছানার সাইজ ৬*৬ ফিট হয়, তাঁর মানে ৩৬ স্কোয়ার ফিট বেডের জন্য দখল হয়ে গেল। তারপরে আপনি একটা কেবিনেট করলেন ৮*২ ফিটের, বেডরুমের আরও  ১৬ স্কোয়ার ফিট চলে গেল।  আপনের বেডরুমের ৫০ শতাংশের বেশি জায়গা দখল হয়ে গেল। তারপরেও আপনার চাহিদা থাকে স্টাডি টেবিল, টিভি ইউনিট, বেডসাইড টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, ওয়ারড্রব ইত্যাদি ফার্নিচারের। কীভাবে ম্যানেজ করবেন? বিছানার নিচে স্টোরেজযুক্ত বেড, ফোল্ডিং টেবিল বা কেবিনেটের সাথে ড্রেসিং টেবিল, স্টোরেজ সুবিধাযুক্ত টিভি ইউনিট, এসব ফার্নিচার বেছে নিন। এছাড়াও বেডরুমে ফ্লোটিং ফার্নিচার ব্যাবহার করুন, যেমন ফ্লোটিং টিভি ইউনিট,  ফ্লোটিং স্টাডি টেবিল,  ফ্লোটিং বেডসাইড টেবিল। এতে তিনটা সুবিধা পাওয়া যায়, ফ্লোর দেখা যাবে, কাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, ভিজুয়ালি ঘরটাকে বেশ হালকা দেখাবে।  

Modern bedroom with laminate finishes on wardrobes and furniture, showing how laminates re-create bedroom style.

৫  সঠিক আলোর ব্যবস্থা করুনঃ 

ছোট বেডরুমে প্রাকৃতিক আলো যত বেশি ঢোকাতে পারবেন তত ভালো। হালকা পর্দা ব্যবহার করুন। রাতে লেয়ার্ড লাইটিং, সিলিং লাইট, ওয়াল স্কনস এবং টেবিল ল্যাম্প ব্যাবহার করুন যা ঘরকে উজ্জ্বল রাখবে।

natural light entering bedroom

৬ ফ্লোরিংঃ

ফ্লোরিং বেডরুমকে ছোট বা বড় দেখাতে সাহায্য করে। বেডরুমে মার্বেল, টাইলস, উডেন ফ্লোর যাই ব্যাবহার করুন, কাটিং যাতে কম হয়। আর এই সব জিনিসের সাইজ যত বড় হবে ততই ভাল, কারন বড়   টাইলস ব্যাবহার করলে ফ্লোরিং জয়েন্ট কম দেখা যাবে। এতে বেডরুম বড় দেখায়। ফ্লোরের রং হালকা টোনের রাখবেন, যাতে পুরো ঘরের ওভারঅল থিমের সাথে মিলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ঘরের দেয়ালের রং অফ-হোয়াইট হলে, ফ্লোরের কালারও সেইম টোনের রাখবেন।

৭ মিররঃ

ইন্টেরিয়র ডিজাইনের সময় মিরর সাধারণত ওভারলুক করা হয়। কিন্তু ছোট বেডরুমের জন্য সঠিক মিরর নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিররের মাধ্যমে ছোট বেডরুমকে বড় দেখনো যায়। বড় মিরর আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটা পারসেপশন তৈরি করে যেন ঘরটা বড় লাগে। কিন্তু ছোট বেডরুমকে বড় দেখাতে মিররের পজিশন সঠিক যায়গায় দিতে হবে। সেরা পজিশন হল দরজা খুললেই সামনের দেয়ালে মিরর লাগাতে হবে। যাতে দরজা খুললেই একটা সুন্দর মিররে পুরো ঘরের প্রতিফলন দেখা যায়।  প্রয়োজনে ড্রেসিং টেবিলে বড় মিরর বা ডিজাইনার মিরর ওয়াল ব্যাবহার করুন। 

Bedroom with a big mirror reflecting soft light and enhances bedroom decoration.

৮ ফলস সিলিংঃ 

ছোট বেডরুমে একাধিক ফলস সিলিং ব্যাবহার করুন। এতে ছোট বেডরুম অনেক বড় ও সুন্দর দেখায়।  অনেকই সিএনসি বা পিওপি ডিজাইনে ঘন ঘন কার্ভ শেপে বা প্যাটার্নে ফলস সিলিং ব্যাবহার করে, এইসব ডিজাইন দেখতে খুব সুন্দর লাগে, কিন্তু এইসব ডিজাইন ছোট বেডরুমের জন্য না।

৯ জানালাঃ

ছোট বেডরুমে জানালা বড় রাখলে ভাল। কারন এতে ঘরে প্রাকৃতিক আলো বেশি পরিমাণ ধুকতে পারে। ঘরে প্রাকৃতিক আলো বেশি পরিমাণ প্রবেশ করলে বেডরুমটা বেশি উজ্জল, খোলা ও বড় দেখায়।

১০. সঠিক লাইটিং ব্যবহার করুন:

লাইটিং ছোট ঘরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাচারাল লাইট যতটা সম্ভব প্রবেশ করতে দিন। পাশাপাশি কভ লাইট, ওয়ার্ম LED বা ওয়াল লাইট ব্যবহার করলে ঘর উজ্জ্বল ও বড় মনে হয়।

১১. উঁচু পর্দা ঝোলান:

পর্দা সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত ঝোলান এবং রডটা সম্ভব হলে সিলিংয়ের কাছে লাগান। এতে ঘরের উচ্চতা বেশি মনে হয়। হালকা রঙের বা শিয়ার ফ্যাব্রিকের পর্দা বেছে নিন। ভার্টিক্যাল স্ট্রাইপযুক্ত পর্দা আরও ভালো কাজ করে। ছোট জানালার জন্যও লম্বা পর্দা ব্যবহার করা উচিত। ফ্লোর থেকে সিলিং পর্যন্ত পর্দা ঘরের উচ্চতা বাড়িয়ে দেখায়, ফলে বেডরুম বেশি স্পেসি ও এলিগেন্ট লাগে।

Share this :

Send Us a Message